লেখকঃ নীলাদ্রি মুখার্জী
সে ছিল তখন ১৯ আর আমি ৩৬,হ্যাঁ বেশ খানিকটা সেই নচিকেতার 'পেসমেকার' গানের মতনই ব্যাপার, কিন্তু সম্পর্কের সমীকরণটা অতটা সহজ ছিলনা। আমার পরিচয়টা দিয়ে দিই আগে,আমি ধ্রুব সাধুখাঁ,বর্ধমানে বাবার বিশাল লোহা লক্করের ব্যবসার,দাদুর বিস্তর জমি জমার ও শতাব্দী প্রাচীন সাধুখাঁদের প্রাসাদপম বসতবাড়ির একমাত্র উত্তরাধিকার। কিন্তু বাংলায় গ্র্যাজুয়েট আমার,সুখ ধাতে সইল না। বাড়ি থেকে ঝগড়া করে কোলকাতায় এসে উঠলাম একটা লড়ঝড়ে মেসে,সাথে সম্বল ও কম্বল বলতে ঐ একটাই স্বপ্ন, লেখক হবো। লেখালেখির হাত বলতে গেলে মোটের ওপর খারাপ ছিল না,আর কপালটাও ছিল বেশ চওড়া। এক নামকরা কাগজের সম্পাদককে জপিয়ে ধারাবাহিক উপন্যাস লিখতে শুরু করলাম তাদের কলামে। আর লেখাটা শুরু হওয়ার সাথে সাথেই বরাতজোরে হিট,আর ফলতঃ আমার নাম ছড়িয়ে পড়তে লাগল প্রকাশনা অফিসের টেবিলে টেবিলে। মাস ছয়েকের মধ্যেই একটা বড় ব্যানার থেকে বই হিসেবে প্রকাশ পেল আমার প্রথম রাজনৈতিক উপন্যাস 'রাজদরবার'। আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি আমাকে,পরের দুবছরে সাতখানা বই,সাতটাই বাম্পার হিট। খবরের কাগজে,সাহিত্য সম্মেলনে,নিউজ চ্যানেলের আড্ডায় তখন একটাই নাম-ধ্রুব সাধুখাঁ। সব ঠিকঠাকই যাচ্ছিল কিন্তু পৌষালির সাথে হঠাৎ।একদিন দেখা হয়ে গেল এক সাহিত্য সম্মেলনে।
সেদিনের সম্মেলনে আলোচনা হচ্ছিল আমার সদ্য প্রকাশিত সামাজিক উপন্যাস 'হঠাৎ তোমার জন্য' নিয়ে। সম্মেলনে হঠাৎই পৌষালি উঠে দাঁড়িয়ে তীব্র আক্রমন করে আমাকে।অভিযোগ-উপন্যাসে আমি নাকি নারীদেরকে অবজেক্টিফাই করে দেখিয়েছি। তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ আর যুক্তির তরবারি দিয়ে আমাকে সে ফালাফালা করছিল,রক্তাক্ত করছিল আমার সৃষ্টিকে কিন্তু কেন জানিনা আমার গায়ে সেগুলো লাগছিল না। অবাক হয়ে মুগ্ধতার সাথে তাকিয়ে ছিলাম তার কালো দীঘির মত গভীর পটলচেরা চোখ দুটির দিকে। টিকোলো নাক আর গোলাপ পাপড়ির মতো ঠোঁটের নেশায় মত্ততার সেই শুরু। ওর কথাগুলো না শুনলেও,সেদিন সন্ধ্যাতেই কফি হাউসে বসে পৌষকে শুনিয়েছিলাম উপন্যাসের অন্তর্নিহিত অর্থ। হ্যাঁ পৌষ,অজান্তেই সে আমার পৌষ হয়ে উঠেছিল। আমি না জানলেও সে কিন্তু জানতো যে ধ্রুব তারার গ্রহন নিশ্চিত হয়েছে ঐ কালো দীঘির জলে। আর্ট কলেজের মেধাবী ছাত্রী ছিল পৌষ,আমার বেশ কিছু লেখার ইলাস্ট্রেশন ওরই আঁকা ছিল। আমার সব পান্ডুলিপি প্রকাশকের আগে পৌষ দেখত,চলতো কাটাছেঁড়া ও চুলচেরা বিশ্লেষণকখনও কফি হাউসে,কখনও সিটি সেন্টারের রুফটপে আবার কখনও আমার শান্তিনিকেতনের ফ্ল্যাটের বিছানায় আমার কাঁধে মাথা এলিয়ে। পৌষ বিছানা থেকে উঠে গেলে অনেকক্ষণ বিছানায় মুখ গুঁজে শুয়ে থাকতাম আমি,পৌষের গন্ধ যতটুকু বিছানায় থাকতো পুরোটা শুষে নিতে চাইতাম। পৌষ যখন আমার কাছে থাকত তখন লেখালেখি সব মাথায় উঠত,মাঝে মাঝে সে মজা করে বলত-'লেখক,পাঠিকার সাথে সারাদিন অভিসারে থাকলে ,লেখালেখি যে মাথায় উঠবে।' সত্যি বলতে কি,আমার লেখাগুলো তখন লিখতাম পৌষের জন্য ই। কার কিরকম লাগবে ভাবনাচিন্তা ছেড়ে,পৌষের কেমন লাগবে তা ভেবেই চলত আমার কলম। কখনো কখনো পৌষের পাঠিকা সত্ত্বাটা যেন আমার কাছে প্রধান হয়ে উঠত তার প্রেয়সী সত্ত্বাটাকে প্রচ্ছন্ন করে দিয়ে। সাত পাঁচ না ভেবেই অবলীলাক্রমে পান্ডুলিপির গোছা তুলে দিতাম পৌষের জিম্মায়। দিনের পর দিন সেগুলো পৌষের টেবিলে শোভা পেত,প্রকাশকের টেবিলের বদলে। প্রকাশকদের পান্ডুলিপি দেওয়ার হাজারো অনুরোধ, ফোন কল এক চুটকিতে সরিয়ে দিতাম পৌষের সার্টিফিকেশনের প্রতীক্ষায়।
সেবার জাঁদরেল প্রকাশক 'সেন এন্ড কোং' দুই লক্ষ টাকা অফার করে বসল আমার পুজোর বইটার জন্য। বেশ লোভনীয় অফার,জাঁকিয়ে লিখলাম তিনমাস ধরে। যথারীতি পান্ডুলিপি নিয়ে গেল পৌষ,বলল পরের সপ্তাহে দিয়ে যাবে। লেখা জমা দেওয়ার শেষ দিন আগে আসতে লাগল কিন্তু এবার পৌষ আর ফিডব্যাকগুলো জানাচ্ছে না। সেদিন উদ্দাম আদরের পর যখন জিজ্ঞেস করলাম,উত্তর এলো -'পরশু পাবে।' আপত্তির জায়গা নেই,কেননা পৌষের জন্য ই লেখা তাই তার অধিকার আছে পান্ডুলিপি আটকে রাখার। এবার কিন্তু যথাসময়ে ই দিয়ে গেল পৌষ,শুধু বলল 'দারুন হয়েছে,একেবারে পারফেক্ট'। আমি তো আত্মহারা,নাচতে নাচতে পরদিনই পান্ডুলিপি নিয়ে রওনা দিলাম সেন কোম্পানির কাছে। প্রকাশক হাতে নিয়ে পাঁচ ছয় পাতা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ে,ভ্রু কুঁচকে পান্ডুলিপিটা টেবিলের ওপর রেখে আমার দিকে তাকিয়ে অবজ্ঞাসূচক ভঙ্গিতে বললেন
-'ধ্রুব বাবু,আপনাকে তো ভদ্রলোক বলে জানতাম। তা আপনিও দেখছি চিটিংবাজি শুরু করেছেন।'
অপমানে কান লাল হয়ে গেল আমার। টাকা দিচ্ছে বলে কি অপমান করার সুযোগ পেয়ে গেছে নাকি স্কাউন্ড্রেলটা। বেশ রাগতঃ গলাতেই বললাম
-'আপনার সাহস হয় কি করে আমাকে এই কথা বলার? আপনি জানেন কার সাথে কথা বলছেন।'
-'ছাড়ুন তো মশাই,তরুণ লেখকদের গল্প চুরি করে নিজের নামে চালাতে এসেছেন আবার বড় বড় কথা বলছেন!'
পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল আমার। ভালো করে জিজ্ঞেস করাতে জানতে পারলাম দিন দশেক আগে এক তরুণী এসেছিল এই একই পান্ডুলিপি নিয়ে,এক হাতের লেখা,এক ইলাস্ট্রেশন। নামটা আর জিজ্ঞেস করিনি,শুধু ক্ষমা চেয়ে বেরিয়ে এসেছিলাম। প্রকাশক ভদ্রলোক ঘাঘু লোক, এই সুযোগ ছাড়েননি। পরদিন কাগজে,নিউজ চ্যানেলে ফলাও করে বেরোয় চুরির দায়ে আমার নাম; বুকসেলার্স কমিটি আমাকে ব্ল্যাকলিস্টেড করে। আমার চুরির পাবলিসিটির দৌলতে পৌষের উপন্যাস রমরমিয়ে চলে,কাগজে হাসি মুখে একাডেমি পাওয়ার ছবিও বেরোয় তার। আজ বাবার দোকানে বসে হিসেব মিলাতে মিলাতে ভাবি সেদিন প্রকাশককে পৌষের জন্য চিরকুটটা দিয়ে ভালোই করেছিলাম,তাতে লেখা ছিল
'আমার ছিল যা কিছু, সব ই তো তোমারই জন্য
শুধু একবার আমাকে বলে দেখতে পারতে।'
ইতি
তোমার খসে পড়া ধ্রুবতারা

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন